এ রকম দুঃসময় দেখেনি যুবলীগ

ভোরের টেকনাফ ডেস্ক:: এ রকম দুঃসময় দেখেনি যুবলীগ। নানা স্বেচ্ছাচারিতায় এতদিন পার পেলেও খোদ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খেপেছেন যুবলীগের কর্মকাণ্ডে। অবৈধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে পাকড়াও হচ্ছেন একের পর এক যুবলীগ নেতা। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাদ দিয়ে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির মতো নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়েন যুবলীগের অনেক নেতা। হাজার হাজার কোটি টাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক জগৎ তৈরি করেন তারা। দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা, মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, সাংবাদিক সবাইকে মোটা অংকের মাসোহারা দিয়ে চলছিল তাদের এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড।

যুবলীগ নেতাকর্মীরা বলছেন, টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় ‘সুসময়ের কোকিল’দের ভিড়ে কোণঠাসা হয়েছেন দুঃসময়ের কর্মীরা। সুবিধাভোগী নেতা আর হাইব্রিডদের কর্মকাণ্ডেই বেপরোয়া অপরাধের দুর্নাম নিতে হচ্ছে যুবলীগকে। অথচ আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে রাজপথে লড়াকু ভূমিকা পালন করেছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।

স্বাধীনতার পরের বছর ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর যুবলীগের জন্ম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি প্রতিষ্ঠিত যুবলীগকে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী বিবেচনা করা হয়। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যুবলীগের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক নূর হোসেন ছিলেন যুবলীগ কর্মী। তত্ত্বাবধায়ক সরকার-পূর্ববর্তী সময়ে বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলনে ঢাকার রাজপথ দখল করে যুবলীগ। আওয়ামী লীগের ‘ভ্যানগার্ড’ হয়ে শক্তিশালী কর্মকাণ্ড পরিচালনায় সুনাম ছিল সংগঠনটির। তবে সে সবই গত হয়েছে। তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকায় শৃঙ্খলার সব সীমা ছাড়িয়েছে যুবলীগে।

সম্প্রতি নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে শোভন-রাব্বানীকে অপসারণের নির্দেশ দেওয়ার পর যুবলীগের কিছু নেতার কর্মকাণ্ড নিয়েও চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। দলের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যুবলীগের ঢাকা মহানগরের এক নেতা ক্রসফায়ার থেকে বেঁচে গেছেন। আরেকজন এখন দিনের বেলায় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে চলেন। সদলবলে অস্ত্র নিয়ে ঘোরেন। এসব বন্ধ করতে হবে। যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে, তখন কেউ অস্ত্র নিয়ে বের হয়নি, অস্ত্র উঁচিয়ে প্রতিবাদ করেনি। যখন দলের দুঃসময় ছিল, তখন কেউ অস্ত্র নিয়ে দলের পক্ষে অবস্থান নেয়নি। টানা তিনবার সরকারে আছি। অনেকের অনেক কিছু হয়েছে। কিন্তু আমার সেই দুর্দিনের কর্মীদের অবস্থা একই আছে।’

প্রধানমন্ত্রীর এমন কঠোর অবস্থানের পরই গত বুধবার র‌্যাব রাজধানীর ফকিরেরপুলে ইয়ংমেন্স ক্লাব নামে একটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালায়। সেখানে নারীসহ ১৪২ জনকে আটক করা হয়। ক্লাবের ভেতর থেকে নগদ ২৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। অন্যদিকে একই সময়ে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে অস্ত্রসহ আটক করে র‌্যাব। এরপরই আরেক নেতা জি কে শামীম সাতজন দেহরক্ষীসহ আটক, বিপুল টাকা ও এফডিআর জব্দ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। টেন্ডারজগতের মুঘল হিসেবে পরিচিত শামীমের প্রতিষ্ঠান সরকারের বড় বড় নির্মাণকাজগুলো করে। যুবদল থেকে যুবলীগের নেতা বনে যাওয়া শামীম সংগঠনের প্রভাব খাটিয়ে আর বিভিন্ন স্তরে মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে এ সব কাজ বাগিয়ে নিত। যুবলীগের শীর্ষ কয়েকজন নেতা তার কাছ থেকে কমিশন পেত। গণপূর্তের সাবেক ও বর্তমান প্রকৌশলীদের শত শত কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন বলে গোয়েন্দা তথ্যে বেরিয়ে এসেছে। দোর্দ- প্রতাপশালী এই নেতার পতন দেখে যুবলীগের সব স্তরেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে গ্রেফতারের পর জেরার মুখে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া গোয়েন্দা পুলিশকে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, খালেদের তথ্যে ফেঁসে যেতে পারেন পুলিশ সদর দফতর ও মহানগর সদর দফতরের সাবেক ও বর্তমান মিলিয়ে অনেক শীর্ষ কর্তা। জিজ্ঞাসাবাদকারী সূত্র বলছে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকেই ক্যাসিনো কারবারের ‘গডফাদার’ দাবি করেছেন খালেদ। এর বাইরে যুবলীগের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাসহ ঢাকা সিটি করপোরেশনের অনেকের নাম বলেছেন খালেদ।

এদিকে যেসব নেতার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেছে, তারা কেউই ছাড় পাবে না বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, সবার বিরুদ্ধেই দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। অনেকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। নেতাকর্মীদের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব সংস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনও প্রধানমন্ত্রীর কাছে রয়েছে বলে জানান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী।

দলীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, যুবলীগের হাইকমান্ডের ইন্ধনেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সম্রাট-খালেদরা। নেতারা সুবিধাভোগী হওয়ায় এতদিন কোনো ব্যবস্থা নেননি। এমনকি ২০১৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের চাঁদাবাজির ঘটনা অবহিত হয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের কমিটি ভেঙে দিতে বলেছিলেন স্বয়ং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। কিন্তু শেষ অবধি সে নির্দেশেরও কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার কঠোর অবস্থানে যুবলীগ নেতাদের গ্রেফতারে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর নানা বিতর্কিত বক্তব্যেও বিরক্তি প্রকাশ করছেন নেতাকর্মীরা। এদিকে সাঁড়াশি অভিযানে যুবলীগ নেতাদের সাম্রাজ্য তছনছ হতে বসেছে। গ্রেফতার এড়াতে সুবিধাভোগী নেতারা গা-ঢাকা দিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজধানীর ৬০টি স্পটে অবৈধ ক্যাসিনোর (জুয়ার আসর) সঙ্গে রাজনৈতিক সুবিধাভোগীরা ছাড়াও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা জড়িত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মদদ ছাড়া রাজধানীর বুকে দিনের পর দিন এমন অবৈধ ব্যবসা চলতে পারত না। তারা বলছেন, সরকার যদি সত্যিকার অর্থেই সব অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতার অবসান চায়, তাহলে অপরাধীদের মদদদাতাদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

যুবলীগের সর্বশেষ কমিটি হয় ২০১২ সালের ১৪ জুলাই। চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান ওমর ফারুক চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক হন হারুন-অর-রশিদ। ২০১৬ সালের আওয়ামী লীগের সম্মেলনকে সামনে রেখে অন্যান্য সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি গঠন করা হলেও যুবলীগের আর সম্মেলন হয়নি। সারা দেশের অবস্থা আরও নাজুক। দুই যুগ পার করা ইউনিটের সংখ্যা নেহাতই কম নয়।

📕সংবাদটি লাইক এবং শেয়ার করুন।

শেয়ার করুন !

Daily Vorer Teknaf

সুন্দর আগামী বিনিমার্ণ বাস্তবায়নে এটি একটি অঙ্গীকারবদ্ধ অনলাইন সংবাদ মাধ্যম। 'দৈনিক ভোরের টেকনাফ' সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য প্রিয় পাঠকদের প্রতি অনুরোধ করা হল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *